'টেলিভিশনের স্বর্ণযুগ কোথায় হারিয়ে গেল?' — বর্তমান সংকট নিয়ে মুখ খুললেন মামুনুর রশীদ
বাংলাদেশের নাট্যজগতের অন্যতম কিংবদন্তি অভিনেতা ও নাট্যকার মামুনুর রশীদের কাছে টেলিভিশন শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং একটি সময়ের সাংস্কৃতিক ইতিহাস। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে টেলিভিশনের উত্থান-পতনের সাক্ষী থাকা এই গুণী শিল্পী মনে করেন, একসময় যে নাটক সমাজকে ভাবতে শেখাত, আজ তার অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ঈদের সময় অসুস্থ থাকায় এবারের নাটক দেখা হয়নি। তবে গত কয়েক বছরের ঈদের নাটক দেখে তিনি হতাশ হয়েছেন। তাঁর মতে, এখন অনেক নাটকেই বিনোদনের নামে জোর করে গল্প দাঁড় করানো হয়, এমনকি শিরোনাম দেখেই পুরো কাহিনি অনুমান করা সম্ভব হয়ে যায়।
মামুনুর রশীদ স্মৃতিচারণ করে বলেন, পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশে টেলিভিশন নাটকের যাত্রা শুরু হলেও তখনকার নির্মাতারা সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও অসাধারণ কাজ করেছেন। সেই সময়ের নাটক ছিল মধ্যবিত্ত পরিবারের অন্যতম প্রধান বিনোদন, যা মানুষের জীবনধারা, পোশাক-পরিচ্ছদ, এমনকি ঘর সাজানোর রুচিতেও প্রভাব ফেলত।
তিনি জানান, মুস্তাফা মনোয়ার, আবদুল্লাহ ইউসুফ ইমাম ও মুস্তাফিজুর রহমানের মতো নির্মাতারা শিল্পীদের সৃজনশীল স্বাধীনতা দিয়েছেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল সমাজকে সচেতন করা। এমনকি পাকিস্তান সরকারের নানা বিধিনিষেধের মধ্যেও ঢাকার টেলিভিশনে অভিনেত্রীরা টিপ ও শাড়ি পরে অভিনয় করতেন, যা ছিল সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক সাহসী প্রকাশ।
স্বাধীনতার পর কিছুদিন সেই স্বাধীন পরিবেশ বজায় থাকলেও এরশাদ আমলে আবারও সেন্সরশিপের কারণে সৃজনশীলতার ওপর চাপ তৈরি হয়। তারপরও সে সময়ের নির্মাতা, লেখক ও অভিনয়শিল্পীদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় দর্শক পেয়েছেন বহু মানসম্মত নাটক।
বেসরকারি টেলিভিশনের আগমনকে ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখেন মামুনুর রশীদ। তাঁর মতে, একুশে টেলিভিশনের যাত্রা দেশের নাটক ও সংবাদ—দুই ক্ষেত্রেই নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ধারাবাহিকতা আর ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
তিনি মনে করেন, টেলিভিশনের প্রয়োজনীয়তা এখনও ফুরিয়ে যায়নি। কারণ একটি ধারাবাহিক নাটকের সঙ্গে শতাধিক মানুষের জীবিকা জড়িয়ে থাকে। তবে বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি মহড়ার অভাব এবং মিডিয়া-সংশ্লিষ্ট নন এমন মালিকদের আধিপত্যকে দায়ী করেন।
মামুনুর রশীদের ভাষায়, আগে একটি নাটকের জন্য চার দিন পর্যন্ত মহড়া হতো। এখন সেই সংস্কৃতি প্রায় বিলুপ্ত। ফলে অভিনয়ের গভীরতা ও নির্মাণের মান—দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁর বিশ্বাস, টেলিভিশনকে আবারও দর্শকের আস্থার জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হলে মানসম্মত গল্প, সৃজনশীল স্বাধীনতা এবং পেশাদার পরিবেশ নিশ্চিত করাই সবচেয়ে জরুরি।

Comments
Post a Comment