বাবা দিবসে স্মৃতিচারণে তারকা সন্তানেরা
‘আমার বাবা, আমার জীবনের সুপারহিরো’: বাবা দিবসে স্মৃতিচারণে তারকা সন্তানেরা
একজন বাবা শুধু পরিবারের অভিভাবকই নন, তিনি সন্তানের প্রথম শিক্ষক, সাহসের উৎস এবং জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও বিনোদন অঙ্গনের কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বদের সন্তানদের কাছেও তাঁদের বাবারা ছিলেন ঠিক তেমনই—একাধারে বন্ধু, পথপ্রদর্শক এবং জীবনের আদর্শ। বাবা দিবস উপলক্ষে অভিনেত্রী, নির্মাতা ও বিজ্ঞাপনকর্মী ত্রপা মজুমদার, অভিনেতা সম্রাট, নির্মাতা-অভিনেতা সোহেল আরমান এবং অভিনেত্রী ঐন্দ্রিলা আহমেদ তাঁদের বাবাদের স্মরণ করে ভাগ করে নিয়েছেন আবেগঘন স্মৃতি।
মানুষের মতো মানুষ রামেন্দু মজুমদার
নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার সম্পর্কে বলতে গিয়ে তাঁর মেয়ে ত্রপা মজুমদার জানান, বাবার সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর মানবিকতা।
ত্রপার ভাষায়, তাঁর বাবা সৎ, বিনয়ী ও অসাধারণ সহানুভূতিশীল একজন মানুষ। দেশের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা সবসময়ই তাঁকে মুগ্ধ করেছে। জীবনে অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকার যে গুণ তিনি বাবার মধ্যে দেখেছেন, সেটিই তিনি নিজের জীবনে ধারণ করার চেষ্টা করেন।
তিনি বলেন, খ্যাতির শীর্ষে থেকেও রামেন্দু মজুমদার কখনো প্রচারের আলো খোঁজেননি। অনেকেই তাঁকে গম্ভীর ভাবলেও কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায়, তিনি কতটা আন্তরিক এবং মানুষকে কতটা ভালোবাসেন।
ত্রপার মতে, তাঁর বাবার সবচেয়ে বড় অবদান শুধু পরিবারে নয়, বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনেও। থিয়েটারের মাধ্যমে তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মূল্যবোধের শিক্ষা দিয়েছেন।
মেয়ের সঙ্গে বাবার সম্পর্ক নিয়েও রয়েছে বিশেষ স্মৃতি। ত্রপা জানান, ছোটবেলায় পড়াশোনার দায়িত্ব বেশি সামলাতেন তাঁর মা। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবাই হয়ে ওঠেন সবচেয়ে কাছের বন্ধু। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে থিয়েটার ও বিজ্ঞাপন জগতে কাজ করার ক্ষেত্রে বাবার সমর্থন তাঁকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।
বাবা দিবসে তাঁর একটাই বার্তা—নিজের বাবার পাশাপাশি পৃথিবীর সব বাবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
বাবার শূন্যতা আজও তাড়া করে সম্রাটকে
প্রয়াত কিংবদন্তি অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাক-এর ছেলে অভিনেতা সম্রাটের কাছে বাবা দিবস মানেই আবেগ আর শূন্যতার দিন।
তিনি বলেন, বাবাকে প্রতিদিনই মনে পড়ে, তবে ঈদ কিংবা বাবা দিবসের মতো বিশেষ দিনগুলোতে সেই অভাব আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
সম্রাটের কাছে বাবা ছিলেন বিশাল এক বটগাছের মতো, যার ছায়ায় পুরো পরিবার নিরাপদ থাকত। আজও পারিবারিক কোনো অনুষ্ঠান বা আনন্দঘন মুহূর্তে প্রথমেই বাবার কথাই মনে পড়ে।
সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় বাবার হাত আর ধরে হাঁটতে না পারার জন্য। তিনি জানান, কখনো কখনো শুধু একবার বাবার হাত ধরে বসে থাকার ইচ্ছাই তাঁকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়।
বাবার স্নেহ, ভালোবাসা ও নিরাপত্তাবোধের অভাব কখনো পূরণ হওয়ার নয় বলেই মনে করেন তিনি। প্রয়াত সব বাবার আত্মার শান্তি কামনা করে নিজের বাবার প্রতিও অগাধ ভালোবাসা প্রকাশ করেন সম্রাট।
নিজের পরিচয় নিজেকেই গড়ে নিতে শিখিয়েছিলেন আমজাদ হোসেন
চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনেতা ও লেখক সোহেল আরমান স্মরণ করেন তাঁর বাবা, প্রখ্যাত নির্মাতা আমজাদ হোসেন-কে।
তিনি জানান, বাবা সবসময় চাইতেন তাঁর সন্তান নিজের যোগ্যতায় পরিচিত হোক। একদিন বাবা তাঁকে বলেছিলেন, "বটগাছের নিচে আরেকটি গাছ বড় হতে পারে না।" অর্থাৎ, একজন বিখ্যাত পরিচালকের ছেলে হিসেবে বাবার পরিচয়ের আড়ালে না থেকে নিজের পথ নিজেকেই তৈরি করতে হবে।
সোহেল আরমান সেই উপদেশ মেনে অভিনয়, নির্মাণ ও লেখালেখির মাধ্যমে নিজের পরিচয় গড়ে তোলেন। পরে একসময় আমজাদ হোসেন নিজেই ছেলেকে বুকে জড়িয়ে বলেন, "তুমি নিজের মেধায় নিজের জায়গা তৈরি করতে পেরেছ।"
একদিন কয়েকজন তরুণ আমজাদ হোসেনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "আপনি কি সোহেল আরমানের বাবা?" সেই ঘটনাটি তাঁকে ভীষণ আনন্দ দিয়েছিল। বাড়ি ফিরে তিনি ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, এটাই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
এমনকি ছেলের নামেও নিজের পদবি যুক্ত করেননি তিনি, যাতে কোনোদিন বাবার পরিচয়ের ওপর নির্ভর না করতে হয়।
বাবার জীবনের শেষ ১২ বছরে তাঁরা একসঙ্গে অসংখ্য সময় কাটিয়েছেন। চিকিৎসার জন্য ব্যাংককে যাওয়া, দীর্ঘ আলাপ আর একসঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো আজও তাঁর কাছে অমূল্য স্মৃতি হয়ে আছে।
বাবার স্মৃতিই আজও শক্তির উৎস ঐন্দ্রিলার
প্রয়াত অভিনেতা বুলবুল আহমেদ-এর মেয়ে অভিনেত্রী ঐন্দ্রিলা আহমেদ বলেন, বাবাকে নিয়ে স্মৃতির শেষ নেই।
তিনি জানান, অভিনয় জীবনে বিভিন্ন জনপ্রিয় চরিত্রের কারণে দর্শক তাঁর বাবাকে কখনো "ভালো মানুষ", কখনো "মহানায়ক", আবার কখনো "দেবদাস" নামেই চিনতেন। তবে পর্দার বাইরের মানুষটি ছিলেন আরও অসাধারণ।
ঐন্দ্রিলা বাবার পরিচালনায় অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছেন, শিখেছেন অভিনয়ের নানা দিক। বাবার কাছ থেকেই শিল্পীজীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছেন তিনি।
জীবনের শেষ সময়ে বাবার সঙ্গে কাটানো দীর্ঘ আড্ডা ও গল্পের মুহূর্তগুলো এখন তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি। বাবাকে নিয়ে নির্মিত একটি তথ্যচিত্র দেখে বুলবুল আহমেদের আনন্দের কথাও স্মরণ করেন তিনি।
উত্তরাধিকার শুধু খ্যাতির নয়, মূল্যবোধেরও
বাবা দিবসে এই চার শিল্পী সন্তানের স্মৃতিচারণ প্রমাণ করে, একজন কিংবদন্তি শিল্পীর সবচেয়ে বড় সৃষ্টি শুধু তাঁর শিল্পকর্ম নয়, তাঁর পরিবারে রেখে যাওয়া মূল্যবোধও। তাঁদের কাছে বাবা মানে শুধু খ্যাতিমান অভিনেতা, নাট্যব্যক্তিত্ব বা নির্মাতা নন—তিনি একজন শিক্ষক, বন্ধু, অভিভাবক এবং আজীবনের অনুপ্রেরণা, যার শিক্ষা ও ভালোবাসা সময় পেরিয়েও জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে পথ দেখিয়ে যায়।
#FathersDay #BangladeshShowbiz #LegendaryFathers #FamilyLegacy

Comments
Post a Comment