‘আমাকে মৃণাল বলে ডাকতেন মুস্তাফা মনোয়ার’: স্মৃতিচারণায় গোলাম ফরিদা ছন্দা
টানা আড়াই মাসের মহড়া, কিংবদন্তি পরিচালকের নিবিড় প্রশিক্ষণ আর অভিনয়ের এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা—মুস্তাফা মনোয়ারের পরিচালনায় ‘স্ত্রীর পত্র’ টেলিফিল্মে অভিনয়ের স্মৃতি আজও আবেগাপ্লুত করে অভিনেত্রী গোলাম ফরিদা ছন্দাকে। সেই সময় তাঁকে ভালোবেসে ‘মৃণাল’ বলে ডাকতেন বরেণ্য এই নির্মাতা।
টেলিভিশন নাটকে প্রায় ২৫ বছরের অভিনয়জীবন গোলাম ফরিদা ছন্দার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ থেকে স্নাতক এই অভিনেত্রী অসংখ্য একক নাটক, টেলিফিল্ম ও ধারাবাহিকে অভিনয় করে দর্শকদের কাছে পরিচিতি পেয়েছেন। বর্তমানে চারটি ধারাবাহিকে কাজ করছেন তিনি। তবে তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প অবলম্বনে নির্মিত মুস্তাফা মনোয়ারের ‘স্ত্রীর পত্র’।
২০০২ সালে নির্মিত এই টেলিফিল্মে মৃণালিনীর চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পাওয়া ছন্দার জন্য ছিল অনেকটা স্বপ্নের মতো। চরিত্রটির জন্য তাঁকে অডিশন দিতে হয়েছিল। অডিশনে আরও অনেক অভিনেত্রী উপস্থিত থাকায় নিজের নির্বাচিত হওয়ার বিষয়ে খুব একটা আশাবাদী ছিলেন না তিনি। কিন্তু তাঁর অভিনয় ও কবিতা পাঠে মুগ্ধ হয়ে মুস্তাফা মনোয়ার তাঁকে পরদিন থেকেই মহড়ায় যোগ দিতে বলেন।
এরপর শুরু হয় দীর্ঘ প্রস্তুতি। প্রায় আড়াই থেকে তিন মাস ধরে চলে নিবিড় মহড়া। চরিত্রের প্রতিটি চিঠি বারবার পড়িয়ে মৃণালিনীর আবেগ, অনুভূতি ও ব্যক্তিত্ব বুঝিয়ে দিতেন পরিচালক। ছন্দার ভাষায়, মুস্তাফা মনোয়ার তাঁকে কখনো ‘মৃণাল’, আবার কখনো ‘মেজো বউ’ বলে ডাকতেন। এমনকি দীর্ঘ মহড়ার পরও তাঁকে সরাসরি জানানো হয়নি যে তিনিই মৃণালিনীর চরিত্রে অভিনয় করছেন!
টেলিফিল্মটির শুটিং শুরু হয় কুমিল্লার একটি পুরোনো জমিদারবাড়িতে। কিন্তু বাড়ির মালিকের আপত্তিতে মাঝপথে শুটিং বন্ধ করে ঢাকায় ফিরতে হয় পুরো ইউনিটকে। পরে মুস্তাফা মনোয়ারের বাসায় স্টুডিও সেট নির্মাণ করে আবারও শুরু হয় কাজ।
শুটিংয়ের সময় পরিচালকের নিখুঁত শিল্পবোধও কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন ছন্দা। একটি দৃশ্যের ক্যামেরার কাজ পছন্দ না হওয়ায় মুস্তাফা মনোয়ার নিজেই ক্যামেরা হাতে তুলে নেন। কোন লেন্স ব্যবহার করতে হবে, কীভাবে রঙ ও দৃশ্যের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে হবে—সবকিছুতেই ছিল তাঁর অসাধারণ দক্ষতা।
প্রচারিত হওয়ার পর ‘স্ত্রীর পত্র’ ছন্দাকে এনে দেয় ব্যাপক প্রশংসা ও পরিচিতি। নির্মাতা ও চিত্রগ্রাহক সাইদুল আনাম টুটুলও তাঁর অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে ফোন করেছিলেন। তবে এই কাজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হিসেবে ছন্দা মনে করেন মুস্তাফা মনোয়ারের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা ও দীক্ষাকে।
অভিনেত্রীর কাছে তিনি শুধু একজন পরিচালক নন, বরং একজন আদর্শ গুরু। তাঁর পাশাপাশি সৈয়দ জামিলের কাছ থেকেও পাওয়া শিক্ষা আজও স্মৃতিতে অমলিন। কিংবদন্তি এই নির্মাতার নির্দেশনায় কাজ করতে পারাকে নিজের শিল্পীজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতা বলেই মনে করেন গোলাম ফরিদা ছন্দা।
একজন পরিচালকের সুনিপুণ নির্দেশনা, একজন অভিনেত্রীর নিষ্ঠা আর রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী সৃষ্টির মেলবন্ধনে ‘স্ত্রীর পত্র’ শুধু একটি টেলিফিল্ম নয়, গোলাম ফরিদা ছন্দার অভিনয়জীবনের এক স্মরণীয় অধ্যায়।
#GolamFaridaChhonda #MustafaMonwar #StrirPotro #BangladeshiDrama

Comments
Post a Comment